মাজারের দিঘির শেষ কুমিরও সুন্দরবনে: অবসান হলো বাগেরহাটের ৬০০ বছরের ঐতিহ্যের
বাগেরহাটের কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়: শতবর্ষের লোকবিশ্বাস ও এক করুণ বিদায়
৬০০ বছরের প্রাচীন এক ঐতিহ্যের অবসান ঘটল বাগেরহাটে। একটি নির্মম দুর্ঘটনা এবং তার প্রেক্ষিতে প্রশাসনের নেওয়া সিদ্ধান্ত কীভাবে বদলে দিল খান জাহান আলীর দিঘির চিরচেনা রূপটি?
বাগেরহাটের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ইতিহাসে কতশত গল্প জমা হয়ে আছে, তার হিসাব মেলা ভার। তবে এই জেলার ধূলিকণায় মিশে থাকা সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের একটি অংশ জুড়ে ছিল হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন 'ঠাকুর দিঘি'। যে দিঘির শান্ত জলে গা ভাসিয়ে ভেসে বেড়াত বিশালাকার কুমির। যুগ যুগ ধরে দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আকুল কণ্ঠে ডাকতেন—"কালাপাহাড়, ধলাপাহাড়, চলে এসো..."
কিন্তু অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক বুক ফাটানো দুর্ঘটনা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে দিঘির শেষ কুমিরটিকে চিরতরে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটল প্রায় ছয় শতাব্দীর এক ঐতিহ্যবাহী লোকবিশ্বাসের।
ইতিহাসের পাতায় কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়
জনশ্রুতি রয়েছে, ১৪০০ শতকের শুরুর দিকে বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত খান জাহান আলী (রহ.) যখন খলিফাতাবাদ (বর্তমান বাগেরহাট) নগর প্রতিষ্ঠা করেন, তখন মানুষের সুপেয় পানির সংকট দূর করতে এই বিশালাকার দিঘিটি খনন করেন। দিঘির ভারসাম্য রক্ষা এবং এক আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গ হিসেবে তিনি এই জলাশয়ে এক জোড়া মিষ্টি পানির কুমির ছেড়ে দেন। আদর করে তিনি পুরুষ কুমিরটির নাম রাখেন 'কালাপাহাড়' এবং নারী কুমিরটির নাম রাখেন 'ধলাপাহাড়'।
খান জাহান আলী (রহ.)-এর মৃত্যুর পরও মাজারের ভক্ত ও খাদেমরা নিজের সন্তানের মতো পরম মমতায় এই কুমিরদের বংশধরদের আগলে রেখেছিলেন। কালক্রমে এই কুমিরগুলো মাজার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মায়, মানত করে কুমিরগুলোকে হাঁস, মুরগি কিংবা ছাগল খাওয়ালে তাদের মনের আশা পূরণ হয়। হিংস্র কোনো আচরণ ছাড়াই যুগের পর যুগ মানুষের পাশাপাশি সহাবস্থান করেছে এই অনন্য বন্যপ্রাণীগুলো।
যদিও ঐতিহ্যবাহী সেই মূল বংশের শেষ পুরুষ কুমির 'কালাপাহাড়' ২০০৬ সালে এবং শেষ নারী কুমির 'ধলাপাহাড়' ২০১৫ সালে মারা যায়। পরবর্তীতে ঐতিহ্য ধরে রাখতে ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক এবং সুন্দরবন থেকে এনে কিছু কুমির এই দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়েছিল।
এক নির্মম দুর্ঘটনা ও ক্ষতের শুরু
দিঘির জলে মানুষের সাথে কুমিরের যে সখ্যতা ছিল, তা হঠাৎ করেই রূপ নেয় আতঙ্কে। ১ জুন (২০২৬) সোমবার রাতে মাজারের দিঘির মহিলা ঘাটে মায়ের সাথে থাকা ৮ বছরের ছোট্ট শিশু ফাতেমা আক্তার দিঘির জলে নামতেই কুমিরের অতর্কিত আক্রমণের শিকার হয়। মুহূর্তের মধ্যে কুমিরটি শিশুটির পা কামড়ে ধরে গভীর পানির নিচে টেনে নিয়ে যায়।
পরদিন ২ জুন ভোরে দিঘির বুক থেকে উদ্ধার করা হয় ছোট্ট ফাতেমার নিথর মরদেহ। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি মাজারের বাসিন্দা, দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের মনে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এর কিছুদিন আগেই এই একই কুমির দিঘির পাড় থেকে একটি কুকুরকে টেনে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল।
জননিরাপত্তা বনাম ঐতিহ্য: এক কঠিন সিদ্ধান্ত
শিশু মৃত্যুর পর ২ জুন রাতে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেনের সভাপতিত্বে প্রশাসন, বন বিভাগ, মাজারের খাদেম ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দীর্ঘ আলোচনার পর দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিঘিতে থাকা একমাত্র কুমিরটিকে চিরতরে সরিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৩ জুন বুধবার সকালে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও উদ্ধারকারী দলের একটি দল মাজারের দিঘিতে অভিযান পরিচালনা করে। বেশ কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর দিঘির পূর্ব পাড়ের একটি অংশ থেকে বিশালাকার নারী কুমিরটিকে অক্ষত অবস্থায় জালে বন্দি করা হয়।
সুন্দরবনে শেষ আশ্রয়
দিঘি থেকে বন্দি করার পর কুমিরটিকে নিরাপদে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে স্থানান্তরের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই এখন থেকে বন্য পরিবেশের সুরক্ষায় থাকবে মাজারের ইতিহাসের শেষ সাক্ষী এই প্রাণীটি।
উপসংহার: ইতিহাসের এক মৌন বিদায়
একটি শিশুর অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো ঐতিহ্য হতে পারে না। তাই প্রশাসন ও বন বিভাগের এই স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন সমাজ স্বাগত জানালেও, মনের অজান্তেই এক বুক নিশ্বাস ফেলছেন অনেকে।
মাজারের দিঘির শান্ত জলে রোদ পোহাতে থাকা কালাপাহাড়-ধলাপাহাড়ের সেই প্রাচীন গল্পগুলো এখন কেবলই ইতিহাসের পাতায় বা বাগেরহাট জাদুঘরের মমিতে স্থান পাবে। ঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হয়তো আর কোনো ভক্ত সুর করে ডাকবেন না—"কালাপাহাড়, ধলাপাহাড়..."। ৬০০ বছরের পুরনো এই অধ্যায়ের সমাপ্তি যেমন যৌক্তিক, ঠিক তেমনই এক দীর্ঘশ্বাসেরও বটে।
